২৬ এপ্রিল ২০১৩ - ১৯:৩০
ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়

মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে সাভারে। চারদিকে শুধু কান্নার মাতম। নাওয়া-খাওয়া আর ঘুমহীন হাজার হাজার মানুষের চোখ খুঁজে ফিরছে প্রিয়জনকে। প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত মানুষগুলো এখন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

বার্তা সংস্থা আবনা : মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে সাভারে। চারদিকে শুধু কান্নার মাতম। নাওয়া-খাওয়া আর ঘুমহীন হাজার হাজার মানুষের চোখ খুঁজে ফিরছে প্রিয়জনকে। প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত মানুষগুলো এখন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বাতাসে লাশের গন্ধ আর স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। যেদিকেই চোখ যায়, দেখা যায় স্বজনের জন্য অশ্র“সজল নর-নারীর ক্লান্তিহীন, নিদ্রাহীন অপেক্ষা! সাভার এখন শোকে মুহ্যমান। এখন বেদনাতুর এক জনপদ। ধসেপড়া রানা পাজার এক বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে সুগন্ধি, গোলাপজল আর জীবানুনাশক ছিটিয়ে চলছে উত্কট গন্ধ চাপা দেয়ার চেষ্টা। বুধবার ধসেপড়া ওই ভবন থেকে শুক্রবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে আরও ২৯টি লাশ। এ পর্যন্ত বিধ্বস্ত ওই ভবনের নিচ থেকে ৩১০ লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে ২৮৮ লাশ। বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ২৬ লাশ পাঠানো হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। উদ্ধারকর্মীরা বলেছেন, ঘটনার পর শুক্রবার রাত ৯টা পর্যন্ত তারা ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেছেন ২ হাজার ৪০১ জনকে। ধ্বংসস্তূপের বিভিন্ন তলায় প্রায় ২০টি সুড়ঙ্গ পথ তৈরি করে আহত ও নিহতদের নিয়ে আসা হচ্ছে। এর মধ্যে গুরুতর আহত অবস্থায় সহস াধিক নারী-পুরুষ রাজধানী এবং সাভারের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। এর মধ্যে শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় পুলিশের দুই সদস্যকে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের এএসআই মুকুল মোহন এবং কনস্টেবল রফিকুল ইসলাম বুধবার ঘটনার কিছু আগে ফাটল দেখার জন্য ভবনটি পরিদর্শনে যান। ওই দুই পুলিশ সদস্যকে উদ্ধারের পর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে শুক্রবার ৯ তলা ওই ভবনের ৪ তলা পর্যন্ত ছাদের অংশবিশেষ সরিয়ে ফেলায় বিভিন্ন ফ্লোরে লাশ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা বলেছেন, ওই তলায় আরও শতাধিক জীবিত লোক রয়েছেন। সেখান থেকে শুক্রবার ৮১ জনকে জীবিত উদ্ধার করে আনা হয়। বাকি চারটি ফ্লোর মাটির নিচে দেবে যাওয়ায় সেখানে আর কাউকে জীবিত উদ্ধারের আশা করছেন না উদ্ধারকর্মীরা। তবে যদি কেউ বেঁচে থাকেন তা হবে অলৌকিক। এদিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে অনেক লাশ অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে শুক্রবার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে গভীর রাতে থানার অদূরে বংশাই নদীর চরে লাশের গাড়ি যেতে দেখেন বলে দাবিও করেছেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিখোঁজদের স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তবে বিভিন্ন স্থানে খোঁজখবর নিয়ে এ খবরের সত্যতা মেলেনি। উদ্ধারকাজ তদারককারী নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী বলেছেন, একজন জীবিত থাকা পর্যন্ত উদ্ধার কাজ চলবে। যারা জীবিত আছেন তাদের মধ্যে অনেককেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও ভেতরে যারা জীবিত আছেন তাদের অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও পাইপ দিয়ে তাদের খাবারও পাঠানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ঘটনাস্থল থেকে পুরো উদ্ধার কাজ তদারকি করছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানক।

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া রানা পাজায় ঘটনার দিন কি পরিমাণ লোক ছিলেন তা কেউ ধারণা করতে পারছেন না। তবে শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত পুলিশের হিসাবেই নিখোঁজের সংখ্যা সহস াধিক। হারিয়ে যাওয়া লোকজনের স্বজনরা পুলিশের খাতায় এ নাম লিখিয়েছেন। সময় যত গড়াচ্ছে ততই দীর্ঘ হচ্ছে নামের তালিকা। তবে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান জানিয়েছেন, ঘটনার পর থেকে তারা পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা অপেক্ষা করবেন। এরপর তারা উদ্ধার অভিযানে ভারি যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরু করবেন। তিনি বলেন, তাদের হিসাবমতে, এ সময়ের মধ্যে ভবনে আটকেপড়াদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকবে না। সে হিসাবে শনিবার থেকে উদ্ধার অভিযানে ভারি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সম্ভাবনা বেশি। ইতিমধ্যেই ফায়ার সার্ভিস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, সেনাবাহিনী, রাজউকসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে ভারি যন্ত্রপাতি এনে জড়ো করা হয়েছে দুর্ঘটনাস্থলে। শুক্রবার মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার থেকে ভারি যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘটনাস্থলে এসেছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব আবু আলম মোঃ শহীদ।

এদিকে ধসেপড়া ভবন থেকে দ্রুত জীবিত এবং নিহতদের উদ্ধার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কবীর হোসেন সরদারের অপসারণ, ভবন ও গার্মেন্ট মালিকদের গ্রেফতারের দাবিতে কয়েক হাজার লোক শুক্রবার ঘটনাস্থলে বিক্ষোভ করেছেন। গার্মেন্ট ফেডারেশনের ব্যানারে শ্রমজীবী হাজার হাজার মানুষ পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে রানা পাজার সামনে চলে আসে। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনার পর পুলিশ অভিশপ্ত রানা পাজার মালিক সোহেল রানা